Slide
previous arrow
next arrow
  • হাজার মাইল জুড়ে

    হাজার মাইল জুড়ে

    বাস থেকে নেমে আধ ঘণ্টার মতো উত্তরে হাঁটতে হাঁটতে ডানপাশে একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প বাগেরহাটের সমেত্মাষপুর স্কুলটা সহজেই শনাক্ত করে রিপন। কিন্তু শহীদ বাবার কবর খুঁজে বের করার অস্থিরতার তোড়ে রওনার সময় তার মাথায় আসেনি যে, আজ সাপ্তাহিক ছুটি – স্কুল বন্ধ। গ্রামগঞ্জের স্কুলে তালা মানে এমন বিরল খা-খা অবস্থা যেন কেউ কোনোকালে এখানে আসেনি, স্কুলটা…

  • শিরোনামহীন

    শিরোনামহীন

    হাশেম খান বাংলাদেশের চিত্রকলার সৃজনধারায় এক সমাজমনস্ক চিত্রকর। তাঁর ক্যানভাসে ধরা আছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন-অভিজ্ঞতার নানা রূপ। প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষ তাঁর চিত্রের মুখ্য বিষয়।

  • অসম্পূর্ণ মধুসূদন 

    অসম্পূর্ণ মধুসূদন 

    আশা আর নিরাশার দোলাচলে দোদুল্যমান ছিল মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন। প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মধ্যে পার্থক্য ছিল বিস্তর। প্রস্ফুটনের কালে অবিকশিত থেকে গেছে তাঁর অনেক স্বপ্ন।

  • কাজী আবদুল ওদুদের ‘সৃষ্টিধর্ম’

    কাজী আবদুল ওদুদের ‘সৃষ্টিধর্ম’

    পাশ্চাত্যে প্রাচ্যদেশীয় সমাজ বিশ্লেষণে একটি মডেল বিদ্যমান। মডেলটি হলো, প্রথাগত বা সনাতন ধর্মব্যবস্থা – পুনর্জাগরণ বা রেনেসাঁস – আধুনিকতা। শাহাদাত এইচ খান তাঁর ‘Th e Freedom of Intellect Movement (Budhir Mukti Andolan) (1926-1938) in Bengali Muslim Thought’(Ph.D dissertation, University of Toronto, 1997)’ শীর্ষক গবেষণাকর্মে এই চিন্তা ছকেই বাঙালি মুসলমান লেখকদের জীবনজিজ্ঞাসার স্বরূপ আলোচনা করেছেন। তবে এক্ষেত্রে তাঁর স্বতন্ত্র অনুসন্ধানও লক্ষণীয়। তিনি আজিজ আহমেদের Islamic Modernism in India and Pakistan 1857-1964 (London, Oxford University Press, 1967), এইচ. এ. আর. গিবের Modern Trends in Islam (London, Victor Gollancz Ltd. 1946) এবং ডব্লিউ. সি. স্মিথের Islam in Modern History(London, Oxford University Press, 1966) প্রভৃতি গ্রন্থে বাঙালি মুসলমানের চিন্তা ও কর্ম না থাকার কারণ চিহ্নিত করেছেন। পাশ্চাত্যে উপমহাদেশের মানববিদ্যা চর্চায় ভারতের আধুনিকতাবাদী মুসলমানদের মধ্যে শুধু উর্দুভাষী মুসলমান বুদ্ধিজীবীর প্রসঙ্গ এসেছে। যদিও কোনো কোনো রচনায় বাঙালি মুসলমানের প্রসঙ্গ আসে, তবে তা বিচার ও বিশ্লেষণ ব্যতীত শুধু উল্লেখ করা হয়েছে। শাহাদাত পাশ্চাত্য চিন্তার মডেল অস্বীকার করেননি। তবে বাঙালি মুসলমানের মুক্তচিন্তাপ্রসূত সমন্বয়ধর্মী, যুক্তিবাদী ধারাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। উপমহাদেশের মুসলমানরা পাশ্চাত্য থিসিস অনুসারে সনাতনপন্থী কিংবা আধুনিক উদারনৈতিক – এমন ধারণার সঙ্গে তিনি দ্বিমত পোষণ করেছেন। শাহাদাত বিশ শতকের প্রথমার্ধের বাঙালি মুসলমান চিন্তকদের তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন – নব্য গোড়াপন্থী, উদারপন্থী ইসলামি বুদ্ধিজীবী,…

  • ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের শতবর্ষে আবদুল কাদির

    ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের শতবর্ষে আবদুল কাদির

    উনিশ শতকে নবযুগের নতুন সূর্যের নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে মহানগর কলকাতা, সূচিত হয় এক নতুন যুগের, ঐতিহাসিকরা যার নাম দেন বেঙ্গল রেনেসাঁস বা নবজাগৃতি। নতুন যুগের ভোরে রামমোহন, দ্বারকানাথ, দেবেন্দ্রনাথ, কেশব সেন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখের মননচর্চার হাত ধরে হিন্দুসমাজের যখন ঘুম ভাঙছে, বাঙালি মুসলমান সমাজে তখন গভীর রাত। এরা তখনো উনিশ শতকের মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি, যেন কোনো প্রাচীন কৌমের সদস্য। তখনো তারা পাশ্চাত্য শিক্ষা, মননচর্চা ও সিভিল সমাজ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। সংগত কারণেই বাঙালি মুসলমান সমাজে উনিশ শতকীয় রেনেসাঁসের আলো ঢুকতে পারেনি, যেমন ঢুকেছিল ওপরতলার শিক্ষিত বর্ণহিন্দু ও ব্রাহ্ম সমাজে। উনিশ শতকের প্রথমদিকেই রাজা রামমোহন বাঙালির ভাবজগতে ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্তিবাদের মেলবন্ধন রচনা করে এক নতুন ধারা প্রবর্তনে সচেষ্ট হন। হিন্দু ধর্ম, ক্রিশ্চিয়ানিটি ও ইসলামের শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্য ও সুকৃতিসমূহ আত্মস্থ করে হিন্দুধর্মকে তিনি নতুনভাবে নির্মাণ করতে ব্রতী হলেন। বাইবেল, কোরআন ও শঙ্করের অদ্বৈতবাদের পাঠ গ্রহণ করে ভারতবাসী তথা বাঙালি সমাজকে জানিয়ে দিলেন, বিশ্বের প্রতিটি ধর্মের লক্ষ্য অভিন্ন। মানবজাতির নৈতিক উৎকর্ষ সাধন এবং মানুষের ভেতর শ্রেয়োবোধ জাগাতে যুগের প্রয়োজনে প্রতিটি ধর্মের পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্ব্যাখ্যা হওয়া আবশ্যক। তিনি বললেন, আত্মিক মুক্তির জন্য স্বধর্ম বা স্ব-সম্প্রদায় ত্যাগের কোনো প্রয়োজন নেই। বরং অন্ধত্ব, গোঁড়ামি, কূপমণ্ডূকতা ও কুসংস্কার ত্যাগ করে প্রতিটি ধর্মের ভিতর যে মানবিক ও নৈতিক দিকগুলো রয়েছে সেইগুলো গ্রহণ করা জরুরি। ধর্ম সম্পর্কে রামমোহনের মতামত ভারতীয় হিন্দু সমাজকে দারুণভাবে নাড়া দিয়ে যায়, যদিও সমকালে তাঁর মতামত সেইভাবে গৃহীত হয়নি, আবার খাটো করার স্পর্ধাও কেউ দেখাতে পারেনি। রামমোহনের সমসময়ে বাঙালি মুসলিম সমাজের চিন্তাজগতে পরিবর্তনের তেমন কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না। কোনো চিন্তক যুক্তির সঙ্গে ধর্মবিশ্বাসের মিলন রচনার চেষ্টা করেছিলেন কি না, তারও সন্ধান পাওয়া যায় না। বাঙালি মুসলমানের চিন্তাজগতে অগ্রগামী ও মিলনধর্মী চিন্তার আভাস পাওয়া যায় অনেক পরে, আজ থেকে একশ বছর আগে (১৯২৬) ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজ তথা শিখাগোষ্ঠীর চিন্তানায়কদের মাধ্যমে। শিখাগোষ্ঠীর অভ্যুদয়কালে বিদ্রোহী কবি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর কবিতা-গান-গজল বাংলার তরুণচিত্তে উন্মাদনা সঞ্চার করেছে, প্রেম ও দ্রোহের এক অমোঘ আবর্তনে দলে দলে মানুষ, বিশেষত তরুণ সমাজ নজরুলকে ঘিরে অনুপ্রাণিত ও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু বাঙালি মুসলমান প্রভাবশালীরা তাকে আন্তরিক আবেগে সেইভাবে বরণ করে নিতে পারেননি। সেই দ্বন্দ্বমুখর সময়ে শিখাগোষ্ঠীর তরুণ চিন্তক-সংগঠকরা বাঙালি মুসলমান সমাজের জ্ঞানের দীপশিখা জ্বালাতে চেয়েছিলেন। তরুণ তুর্কিদের ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর শিখার আলো জ্বলেছিল ক্ষণকালের তরে, মাত্র পাঁচ বছর। ফলে চারদিকের প্রগাঢ় অন্ধকার দূর করা সম্ভব হয়নি। যুগের প্রয়োজনে ধর্ম, সাহিত্য ও সাহিত্য-ব্যক্তিত্বদের তাঁরা পুনর্মূল্যায়ন করতে চেয়েছিলেন। আবুল হুসেন (১৮৯৭-১৯৩৮), কাজী আব্দুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), কাজী আনোয়ারুল কাদির (১৮৮৭-১৯৪৮), কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শ্রেণির ছাত্র আবুল ফজল (১৯০৩-৮৩), ঢাকা কলেজের ইন্টারমিডিয়েট শ্রেণির ছাত্র আবদুল কাদির (১৯০৬-৮৪) প্রমুখ তরুণ চিন্তক ১৯২৬ সালে ঢাকা শহরে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে যে  সাহিত্য-সংগঠনটি গড়ে তোলেন, তার মূলমন্ত্র ছিল বুদ্ধির মুক্তি। সংগঠনের মুখপত্র শিখার প্রথম সংখ্যায় প্রকাশকের নিবেদনে বলা হয় : ‘শিখার প্রধান উদ্দেশ্য বর্তমান মুসলমান সমাজের জীবন ও চিন্তাধারার গতির পরিবর্তন সাধন।’ শিখা ও মুসলিম সাহিত্য সমাজের সংগঠকরা বিশ্বাস করতেন, বুদ্ধির মুক্তি ভিন্ন বাঙালি মুসলমান সমাজের চলার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। এ-প্রসঙ্গে শিখাগোষ্ঠীর প্রাণপুরুষ আবুল হুসেনের মন্তব্য : ‘মুসলমান জগৎ বুদ্ধির ঘরে তালা লাগিয়ে কেবল শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে মুসলমানের চলার পথে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।’১ আবদুল কাদির ছিলেন ঢাকার বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় উদ্যোগী ও অগ্রণী ব্যক্তিত্ব; অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। শিখা গোষ্ঠী কিংবা মুসলিম সাহিত্য সমাজের চিন্তাচর্চা তৎকালীন বাঙালি মুসলমান সমাজে কী ধরনের প্রভাব বিস্তার করেছিল, কোন ভাবকল্প নিয়ে শিখাগোষ্ঠী আবির্ভূত হয়েছিল, তাদের বৌদ্ধিক তৎপরতার অনুগামী কারা ছিলেন – আজ শতবর্ষ পরে সেসব জিজ্ঞাসার উত্তর পাওয়ার জন্য আবদুল কাদিরকে মূল্যায়ন খুবই জরুরি।  দুই নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শিখা সমকালে বাঙালি মুসলমান শিক্ষিত সমাজে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, যদিও সাধারণ জনমানুষের সঙ্গে পত্রিকাটির কোনো সম্পর্ক ছিল না। ডিরোজিওর ইয়ং বেঙ্গল মুভমেন্টের সঙ্গে তুলনা করে শিবনারায়ণ রায় শিখাগোষ্ঠীর তৎপরতাকে চিহ্নিত করেন ‘আ নিউ রেনেসাঁস’ হিসেবে। শিখার যে প্রথম সংখ্যা (চৈত্র, ১৩৩৩) প্রকাশিত হয় তার সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক আবুল হুসেন আর প্রকাশকের দায়িত্ব পালন করেন আবদুল কাদির। কাদির ছিলেন একাধারে কবি,…

  • আবু ইসহাক : গ্রামীণ জীবনের রূপকার 

    আবু ইসহাক : গ্রামীণ জীবনের রূপকার 

    আবু ইসহাকের (১৯২৬-২০০৩) প্রথম উপন্যাস সূর্য-দীঘল বাড়ী প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে।  তিনি পাঁচ দশকের বেশি সময় সাহিত্যজগতে বিচরণ করলেও তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা মাত্র আটটি। এ-লেখকের গ্রন্থসংখ্যা কম হওয়ার একটি প্রধান কারণ পেশাগত জীবনের ব্যস্ততা। আবু ইসহাক যথেষ্ট লিখতে পারেননি বলে তাঁর মধ্যে ‘আক্ষেপ’১ ছিল। উপরন্তু জীবনের শেষ এক যুগেরও বেশি সময় তিনি প্রধানত অভিধান সংকলনের কাজে নিয়োজিত ছিলেন বলে সৃজনশীল সাহিত্য রচনায় মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। আবার কিছু বাস্তব কারণে তিনি কখনো হয়তো সাহিত্য রচনার উৎসাহ হারিয়েছিলেন, তার কিছু দিকও লেখক উল্লেখ করে গিয়েছেন একটি নিবন্ধে।২  ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফল প্রকাশের পূর্বেই মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯৪৪ সালের মে মাসে বেসামরিক সরবরাহ বিভাগে যোগ দিয়ে আবু ইসহাক তাঁর কর্মজীবনের সূচনা করেন। সিভিল সাপ্লাই বিভাগে কর্মকালে আবু ইসহাক নারায়ণগঞ্জ, পাবনা, ঢাকা ও কলকাতায় দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তবে ওই পদে অধিকাংশ সময় তাঁর নারায়ণগঞ্জেই কাটে।৩ নারায়ণগঞ্জে অবস্থানকালেই তিনি সূর্য-দীঘল বাড়ী লেখা শুরু করেন – তরুণ চোখে দেখা অভিজ্ঞতার নিবিড় রূপায়ণ চলে লেখার খাতায়। তখনো বাংলায় দুর্ভিক্ষের প্রভাব কাটেনি। সূর্য-দীঘল বাড়ীতে তিনি যে জয়গুন, হাসু, শফির মা, লালুর মাকে এঁকেছেন সেই শ্রেণির অন্ত্যজ মানুষকে তিনি কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ট্রেনে চলার পথে। ওই সময়ই আবু ইসহাক জয়গুনের মতো সংগ্রামী নারী ও তার সাথিদের দেখেছেন ট্রেনে করে ময়মনসিংহ যেতে আবার থলিভরা চাল নিয়ে ময়মনসিংহ থেকে ফিরতে। ফতুল্লা, চাষাঢ়া প্রভৃতি স্টেশনে পৌঁছার আগেই চালের থলিগুলো দুপদাপ পড়তো রেলরাস্তার পাশে। আরো দেখেছেন নারায়ণগঞ্জ রেল ও স্টিমার স্টেশনে হাসুর মতো নম্বরবিহীন ক্ষুদে কুলিদের।৪ ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি সূর্য-দীঘল বাড়ী লেখা শুরু করেন। ‘হামিদা কুটির’ নামক বাড়ির মেসে থাকাকালে সূর্য-দীঘল বাড়ীর প্রথম অর্ধেকটা রচিত হয়। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে আবু ইসহাক বদলি হন পাবনায়। পাবনা শহরে প্রথমে একটি মেসে উঠলেও সে-জায়গাটি লেখালেখির জন্য অনুকূল মনে হয়নি; তাই তিনি পাবনা শহরের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত এক পণ্ডিতের বাড়ি ‘সপ্ততীর্থকুটিরে’ ওঠেন মাসিক ৫০ টাকা ভাড়ায়। সে-বাড়ির অনুকূল নির্জন দোতলায় বসে ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে সূর্য-দীঘল বাড়ী লেখার কাজ শেষ করেন।৫ অবশ্য উপন্যাস লেখার ফাঁকে নারায়ণগঞ্জ, কলকাতায় বসে তিনি একাধিক গল্প লেখেন। কিন্তু সূর্য-দীঘল বাড়ী উপন্যাসটি বই আকারে প্রকাশের জন্য প্রায় সাত বছর অপেক্ষা করতে হয়। ইতোমধ্যে আবু ইসহাক ১৯৪৯ সালে পুলিশ বিভাগে চাকরি নিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য সারদা পুলিশ ট্রেনিং কলেজে যোগদান করেন। প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসে শিক্ষানবিশ সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে ঢাকার তেজগাঁও থানায় যোগদান করেন।  কবি গোলাম মোস্তফার আগ্রহে সূর্য–দীঘলবাড়ী উপন্যাসটি নওবাহার পত্রিকায় ১৯৫১-৫২ সালে প্রকাশ পায়। পরবর্তীকালে ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে (১৩৬২ বঙ্গাব্দ) এ-উপন্যাস কলকাতার নবযুগ প্রকাশনী থেকে গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়।৬ উপন্যাসটি প্রকাশের পর আবু ইসহাক বাংলা সাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক হিসেবে বিবেচিত হন। মুনীর চৌধুরী (১৯২৫-৭১) বাংলাদেশের যে তিনটি উপন্যাসকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করতেন সূর্য-দীঘল বাড়ী সেগুলোর অন্যতম।৭  আবু ইসহাকের কাহিনি নিয়ে মসিউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী নির্মাণ করেন সূর্য-দীঘল বাড়ী নামক চলচ্চিত্র। ছবিটির মুক্তিকাল ৩০শে ডিসেম্বর ১৯৭৯। এটি ছিল সরকারি অনুদানে নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র। তবে প্রদর্শকদের অনীহার কারণে ছবিটিকে প্রথমে ঢাকায় মুক্তি দেওয়া যায়নি। ১৯৭৯ সালের ৩০শে ডিসেম্বর নাটোরের গীত সিনেমা হলে প্রথম প্রদর্শিত হয়।৮ পরে ১৯৮০ সালে ঢাকার পাঁচ-ছয়টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন শুরু হয়। সিনেমাটি সাধারণ দর্শকদের কাছে তেমন গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়ায় ব্যবসাসফল হয়নি। তবে কাহিনি ও নির্মাণশৈলীগুণে চলচ্চিত্রটি এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে নির্মিত অন্যতম শিল্পসফল চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছবিটি বহু পুরস্কার লাভ করে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এ-চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে বলেন : ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী আমাদের চলচ্চিত্রে একচ্ছত্র দাপটে প্রতিষ্ঠিত ন্যাকা, ছ্যাবলা ও নকলবাজে গিজগিজ করা বাড়িঘর কাঁপাবার জন্য প্রথম প্রকৃত আঘাত। … এই ছবি বাংলাদেশের গরিব ও শোষিত গ্রামবাসীর জীবনযাপনের একটি অন্তরঙ্গ পরিচয়।’৯  আবু ইসহাকের দীর্ঘ পরিশ্রমের ফল সমকালীন বাংলাভাষার অভিধান (স্বরবর্ণ অংশ) বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশ পায় ১৯৯৩ সালে। অভিধান প্রণয়নের জন্য তিনি ১৯৯৩-৯৪ সালে মানিক মিয়া গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন। অভিধানটি রচনার জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করেন। সত্তরোর্ধ্ব বয়সে তিনি এই কাজে প্রতিদিন ১২-১৪ ঘণ্টাও ব্যয় করেছেন।  দুই আবু ইসহাক প্রকৃতপক্ষে নিরীক্ষাপ্রবণ সাহিত্যিক নন। তিনি মূলত realism ধারার লেখক। এই ধারার একজন শিল্পস্রষ্টা বিশেষ জটিলতায় না গিয়ে বাস্তব মানুষ, সমাজ ও প্রকৃতিকে স্বচ্ছ কাচের ভেতর দিয়ে যেভাবে দেখেন, সেভাবেই তুলে আনেন। অন্যদিকে নন-রিয়েলিস্টিক শিল্প-সাহিত্যকে সমালোচকেরা বিকৃত আয়নায় দেখা পৃথিবী বলে মনে করেন।১০  অবশ্য শিল্প-সাহিত্যে বাস্তব জগতের অনুকৃতি হলেও সেখানে হুবহু অনুকরণ করা হয় না, বাস্তববিশ্ব লেখকের চেতনা ও শিল্পীসত্তা দ্বারা জারিত হলে তবেই শিল্পসৃষ্টি সম্ভব হয়। আবু ইসহাক যখন তাঁর প্রথম উপন্যাস  সূর্য-দীঘল বাড়ী প্রকাশ করেন ততদিনে বিশ্বসাহিত্যে গল্প-উপন্যাসের শিল্পগত দিক ও অঙ্গপ্রকরণ নিয়ে বহুবিধ পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ সাধিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, অমিয়ভূষণ মজুমদার, কমলকুমার মজুমদার, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ প্রমুখ ঔপন্যাসিক ভাব, আঙ্গিক ও ভাষাশৈলীর দিক থেকে নানা দুঃসাহসী পথে অগ্রসর হয়েছেন। সে-সকল নিরীক্ষার পথ আবু ইসহাককে তেমন আকৃষ্ট করেনি। অবশ্য শুধু নতুন আঙ্গিক বা নিরীক্ষা-বৈশিষ্ট্য দ্বারা সাহিত্যের উৎকর্ষ বা আধুনিকতা বিচার করা সংগত নয়। উপরন্তু আবু ইসহাকের এই শিল্পপ্রয়াসকে ক্ষেত্রবিশেষে উত্তর-আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও মূল্যায়ন করা যেতে পারে। পাশ্চাত্যের অনুকরণে যে-আধুনিকতা তাকে প্রত্যাখ্যান করে হয়তো কলকাতা থেকে বহুদূরে সন্ধ্যায় মনসামঙ্গল বা ইউসুফ জুলেখা পুথির ঘরোয়া আসর বসেছে খোলা উঠানে। ইংরেজ-সৃষ্ট নকশার সকল চাপ সহ্য করে দিন শেষে অদ্ভুত পুথির আনন্দে মেতেছে তারা। অন্য একটি পক্ষ বাঙালির হৃদয়কে আরোপিত আধুনিকতা থেকে রক্ষা করে সঞ্জীবিত রেখেছিলেন, এরাই বাংলার প্রথম উত্তর-আধুনিক। এক্ষেত্রে নর্দমার মধ্যে মাথা গোঁজা’ বা ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’ অথবা নানাবিধ যৌনগন্ধী সংলাপ ওই আধুনিকতার অনেকটা ব্যর্থ অনুকরণ বলে উত্তর-আধুনিকগণ মনে করেন। তাঁদের বিচারে যে-সূত্রে গোবিন্দচন্দ্র দেব, যতীন্দ্রমোহন বাগাচী, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, ফররুখ আহমদকে ঈষৎ আধুনিক ভাবা হয়েছে, সেই সূত্রেই তাঁরা ‘উত্তর-আধুনিক’।১১ বাংলার গ্রামীণ ও লোকজীবন অংকনে সিদ্ধহস্ত কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাকের দুটি উপন্যাস মূল্যায়নেও ক্ষেত্রবিশেষে তাঁকে ‘উত্তর-আধুনিক’ বলে মনে করা অবান্তর নয়।  আবু ইসহাক তাঁর তিনটি উপন্যাসেই কাহিনি উপস্থাপনের প্রথানুগ বৃত্তবদ্ধ রীতিটি গ্রহণ করেছেন। তিনি direct method ধরেই অগ্রসর হন, এ-পদ্ধতিতে লেখক সর্বজ্ঞ,…

  • রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি শিরাতোরি সেইগো 

    রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি শিরাতোরি সেইগো 

    জাপানি থেকে বাংলায় ভাবানুবাদ : প্রবীর বিকাশ সরকার তাইশোও যুগে (১৯১২-২৬) দু’বার জাপানে আগমন করা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিগুলি আজ অনেকটাই দূরের হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ যে একজন অসাধারণ কবি এবং দেশপ্রেমিক ছিলেন একথা যথার্থই; কিন্তু তিনি যে এমন একজন ব্যক্তি তা প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর ধরে খুব একটা পরিচিত ছিল না। এই মহান কবি বিশ্বে পরিচিত হয়ে ওঠেন, যার সূচনা হয় ১৯১২ সালের গ্রীষ্মকালে, যখন আইরিশ কবি ইয়েটস তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন। এর পরের বছর শীতকালে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করে কবি হিসেবে আরো বিখ্যাত হন। এরও তিন বছর পর (১৯১৬) শীতে তিনি  প্রথমবার জাপানে আগমন করেন। জাপানের সমাজ ও সাহিত্যজগতে রবীন্দ্রনাথ আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেন। এরপর তাঁর কাব্য গীতাঞ্জলি, দ্য গার্ডেনার, সমালোচনা দ্য রিয়ালাইজেশন অফ লাইফ (সাধনা) প্রভৃতি জাপানি ভাষায় অনূদিত হলে পাঠকদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। কিন্তু প্রাচ্যের এই মহান কবি আমাদের দেশে তেমনভাবে গৃহীত হননি এবং তাঁর প্রভাবও প্রায় ছিল না। দুঃখের বিষয়, এই অনুবাদগুলো কেবল সাময়িক আলোচনামূলক প্রকাশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যাঁরা তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে য়োশিদা গেনজিরোও, মাশিনো সাবুরোও এবং মিউরা সেকিজোওর নাম আমি স্মরণ করতে পারি।  নির্মল আস্থাভাজন এই কবিকে কেন জাপানের কাব্যজগৎ গ্রহণ করেনি? সে-সময়ে আমাদের কাব্যজগতে একদিকে ফরাসি প্রতীকবাদী কবিতাকে পুষ্টিস্রোত হিসেবে গ্রহণ করে গড়ে ওঠা কবিতা সমৃদ্ধ হচ্ছিল; অন্যদিকে য়োরোপীয় মহাযুদ্ধ-পরবর্তী চিন্তাধারার প্রভাবে অ্যাংলো-আমেরিকান ধারার জনপ্রিয় কবিতাও বিকাশ লাভ করছিল। রবীন্দ্রনাথ পুনরায় জাপান সফরে এলে তখনো এই প্রবণতাই প্রভাবশালী ছিল।  নথিপত্র অনুযায়ী, রবীন্দ্রনাথ ১৯১২ সালের শরৎকাল থেকে পরবর্তী বছরের বসন্তকাল পর্যন্ত আমেরিকায় অবস্থান করেছিলেন। তবে এই বিষয়টি প্রায় কোনো গুরুত্বই পায়নি। এমনকি, এমন উদাহরণও আছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, তিনি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরেই বিখ্যাত হন। রবীন্দ্রনাথের প্রথম জাপান ভ্রমণ সম্পর্কে বলতে গেলে, তাইশোও ত্রয়োদশ বর্ষের (১৯২৪) আগস্ট মাসের আসাহি শিম্বুন পত্রিকায় প্রকাশিত আমার নিজের লেখা নিবন্ধগুলোর মধ্যে ‘কবিতা-জগতের বর্তমান অবস্থা’ শীর্ষক রচনার একটি অংশ নিম্নরূপ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাপানে আগমন করলেও চার-পাঁচটি সংবাদপত্রের মাধ্যমে ভূমিকাসুলভ পরিচিতিই ছিল সর্বস্ব। সাধারণের কাছে তাঁর কবিতা ও গদ্য রচনা অনেকাংশেই অপঠিত ছিল। রবীন্দ্রনাথও আমাদের সাহিত্য সম্পর্কে জানার অনাগ্রহ নিয়ে ধূমকেতুর মতো চলে গেছেন। এখানেই রাষ্ট্রদূত ক্লোডেল (ফরাসি কবি, নাট্যকার, কূটনীতিক পল ক্লোডেল, একদা জাপানে ও আমেরিকায় রাষ্ট্রদূত) প্রমুখের সঙ্গে তফাৎ বিদ্যমান। একই প্রাচ্যের মানুষ হয়েও আমাদের মধ্যে আন্তরিক ঘনিষ্ঠতা নেই। অবশ্য কেবল আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার মাধ্যমে আত্মার গভীর মিলন সম্ভব – এমনটা ভাবাও যায় না। কিন্তু কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্বাগত জানানোর নেতৃত্ব সাহিত্যিকরা নন, বরং শিল্পপতি ও শিক্ষাবিদদের মতো ব্যক্তিরাই গ্রহণ করেছিলেন। এই ঘটনাটি সেই সময়ে জাপানের বাস্তব অবস্থা, যেখানে সাহিত্যিক সমাজ ও বৃহত্তর সমাজের মধ্যে একধরনের দূরত্ব বিদ্যমান ছিল, সেই দৃষ্টিতে দেখলে বরং আশ্চর্যজনক বলেই মনে হয়। ভেবে দেখলে, বৈপরীত্যে পরিপূর্ণ কোনো জাতির পক্ষে এর ব্যতিক্রম হওয়াই কঠিন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও প্রবন্ধ, সেই নীরব মহাজাগতিক চেতনার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও, জাতীয় স্বাধীনতার জন্য উচ্চারিত এক উষ্ণ ও তীব্র আহ্বান সেখানে বিদ্যমান এবং তাঁর রচনায় এমন এক সামাজিক চেতনা আছে, যা আমাদের দেশের সাহিত্যিকদের মধ্যে দেখা যায় না। সেই কবিতাও গদ্যের মতো একধরনের স্বাধীনতা ও সরলতা ধারণ করে।  রবীন্দ্রনাথ কেবল উপরিভাগের অভ্যর্থনার মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে থাকার কবি নন, বরং তিনি এমন একজন কবি, যাঁকে আমাদের দেশের মানুষের আরো গভীরভাবে আস্বাদন করা উচিত। এ ধরনের গুণসম্পন্ন সাহিত্যিক আমাদের দেশে অতীতে প্রায় ছিলই না। সমাজসমস্যার স্পন্দন ধারণ করে এমন রচনা সম্প্রতি এর অঙ্কুরোদ্গম দেখাতে শুরু করেছে মাত্র …।  আর যাই হোক, কবি যে সামাজিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আধা-রাষ্ট্রীয় অতিথিরূপে বরণীয় হবেন – এমন দৃষ্টান্ত তখনো দেখা যায়নি। রবীন্দ্রনাথকে নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে একধরনের পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল; এর পেছনে জাপানে নারীশিক্ষার অগ্রদূত নারুসে জিনজোওর প্রচেষ্টার প্রভাব কাজ করেছিল বলে মনে করা হয়। সেই সময়ে জাপানে কোনো সাহিত্যিক গোষ্ঠী আজকের পেন-ক্লাবের মতো সংগঠিত সাহিত্যসমাজ ছিল না তাঁকে গ্রহণ করার জন্য, এমন পরিস্থিতি মোটেই ছিল না;…

সাম্প্রতিক সংখ্যা